সৌদি আরব বললেই একসময় চোখের সামনে ভেসে উঠত মাইলের পর মাইল মরুভূমি আর তেলের খনি। কিন্তু বর্তমান সৌদি আরব তার খোলস ছেড়ে বের হয়ে বিশ্বকে তাক লাগিয়ে দিচ্ছে জ্ঞান, শিল্প আর সংস্কৃতির এক নতুন বিপ্লবে। আর এই রূপান্তরের সবচেয়ে বড় এবং জীবন্ত প্রতীক হলো কিং আব্দুলআজিজ সেন্টার ফর ওয়ার্ল্ড কালচার, যা বিশ্বজুড়ে 'ইথরা' (Ithra) নামে পরিচিত।
আরবি 'ইথরা' শব্দের অর্থ 'সমৃদ্ধকরণ'। সত্যি বলতে, এই কেন্দ্রটি মানুষের মন, মেধা এবং সৃজনশীলতাকে সমৃদ্ধ করার এক অনন্য কারিগর। আপনি যদি সৌদি আরবের পূর্বাঞ্চলীয় প্রদেশে ভ্রমণ করেন, তবে এই স্থাপত্যশৈলী দেখার অভিজ্ঞতা মিস করা মানে এক বিরাট সুযোগ হাতছাড়া করা।
বিশেষ দ্রষ্টব্য: ইথরা নিয়ে আমার চ্যানেলে একটি চমৎকার ডিটেইলস ভিডিও রয়েছে। লেখার পাশাপাশি পুরো সেন্টারের ভেতরের রূপ নিজ চোখে দেখতে চাইলে এখনই আমার ইউটিউব ভিডিওটি দেখে আসতে পারেন!
🔗 https://www.youtube.com/@mrexcusemevlog
ইতিহাসের পাতায় ইথরা: যেখানে তেলের বদলে এখন আলোর সন্ধান মেলে
ইথরা ভবনটি যেখানে দাঁড়িয়ে আছে, তার পেছনে রয়েছে এক দারুণ ইতিহাস। ১৯৩৮ সালে সৌদি আরবের প্রথম বাণিজ্যিকভাবে সফল তেলের খনি "দিলনম্বর ৭" (Prosperity Well No. 7) ঠিক এই জায়গাতেই আবিষ্কৃত হয়েছিল। একসময় যে মাটি থেকে জ্বালানি তেল তুলে দেশের অর্থনৈতিক সমৃদ্ধি এসেছিল, আজ ঠিক সেই মাটিতেই মানুষের মেধা, শিল্প ও সংস্কৃতির বিকাশ ঘটানো হচ্ছে। এটি মূলত সৌদি আরবের জাতীয় তেল কোম্পানি সৌদি আরামকো (Saudi Aramco)-এর একটি দূরদর্শী উদ্যোগ।
চোখের পলক আটকে যাওয়া স্থাপত্যশৈলী
দূর থেকে ইথরা ভবনের দিকে তাকালে মনে হবে মরুভূমির বুকে কয়েকটি চকচকে পাথর নিখুঁতভাবে সাজিয়ে রাখা হয়েছে। নরওয়ের বিখ্যাত আর্কিটেকচার ফার্ম Snøhetta এর ডিজাইন করেছে। পুরো ভবনটি প্রায় ৩৫০ কিলোমিটার দীর্ঘ স্টেইনলেস স্টিলের টিউব দিয়ে মোড়ানো, যা দিনের আলোয় সূর্যের রশ্মি প্রতিফলিত করে এক মায়াবী পরিবেশ তৈরি করে। এর অনন্য স্থাপত্যের কারণে বিশ্বখ্যাত Time Magazine ইথরা-কে বিশ্বের ১০০টি সেরা স্থানের তালিকায় স্থান দিয়েছিল।
ইথরার ভেতরে কী কী দেখার আছে?
ইথরা কেবল বাইরে থেকেই সুন্দর নয়, এর ভেতরে রয়েছে বিশ্বমানের কিছু আকর্ষণ:
- চার তলার সুবিশাল লাইব্রেরি: ৩ লক্ষাধিক বই নিয়ে গঠিত এই লাইব্রেরিটি মধ্যপ্রাচ্যের অন্যতম আধুনিক গ্রন্থাগার। এখানে বসে বই পড়ার অভিজ্ঞতা আজীবন মনে রাখার মতো।
- ইথরা মিউজিয়াম: ৪টি বড় গ্যালারিতে সমসাময়িক শিল্পকলা, সৌদি ঐতিহ্য, ইসলামিক সংস্কৃতি এবং প্রাকৃতিক ইতিহাস প্রদর্শিত হয়।
- থিয়েটার ও সিনেমা হল: এখানে বিশ্বমানের নাটক, অপেরা এবং আন্তর্জাতিক চলচ্চিত্র প্রদর্শনের আধুনিক ব্যবস্থা রয়েছে।
- শিশুদের মিউজিয়াম: এটি সৌদি আরবের প্রথম শিশুদের মিউজিয়াম, যেখানে শিশুরা নানা রকম ইন্টারঅ্যাক্টিভ গেমসের মাধ্যমে বিজ্ঞান ও সংস্কৃতি শিখতে পারে।
- আইডিয়া ল্যাব: তরুণ উদ্ভাবক ও সৃজনশীল মানুষদের নতুন আইডিয়া নিয়ে কাজ করার একটি আধুনিক ল্যাব।
কিভাবে যাবেন (How to Reach)?
ইথরা সৌদি আরবের পূর্বাঞ্চলীয় প্রদেশের ধাহরান (Dhahran) শহরে অবস্থিত।
- আকাশপথে: আপনি যদি সৌদি আরবের বাইরে বা অন্য শহর থেকে আসেন, তবে সবচেয়ে কাছের বিমানবন্দর হলো দাম্মামের কিং ফাহদ আন্তর্জাতিক বিমানবন্দর (DMM)। বিমানবন্দর থেকে ইথরা-র দূরত্ব গাড়িতে প্রায় ৪৫ মিনিট।
- গাড়ি বা ট্যাক্সিতে: খোবার (Khobar), দাম্মাম (Dammam) বা ধাহরানের যেকোনো স্থান থেকে Uber, Careem বা সাধারণ ট্যাক্সি নিয়ে খুব সহজেই ইথরায় চলে আসা যায়। খোবার বা দাম্মাম মেইন সিটি থেকে গাড়িতে যেতে মাত্র ১৫-২০ মিনিট সময় লাগে।
কখন যাবেন এবং সময়সূচী (Timings)
ইথরা পরিদর্শনের জন্য বছরের যেকোনো সময়ই উপযুক্ত, কারণ পুরো সেন্টারটি শীতাতপ নিয়ন্ত্রিত। তবে ভেতরে ঘুরে দেখার জন্য বিকেল বা সন্ধ্যার সময়টা সবচেয়ে দারুণ।
সাধারণ সময়সূচী:
- সোমবার থেকে শনিবার: সকাল ৯:০০ টা থেকে রাত ১০:০০ টা পর্যন্ত।
- শুক্রবার (জুম্মার দিন): বিকেল ৪:০০ টে থেকে রাত ১০:০০ টা পর্যন্ত।
- রবিবার: সাধারণত সাপ্তাহিক বন্ধ থাকে। (দ্রষ্টব্য: রমজান বা ঈদের ছুটির সময় এই সময়সূচী পরিবর্তন হতে পারে, তাই যাওয়ার আগে তাদের অফিসিয়াল ওয়েবসাইট বা অ্যাপ চেক করে নেওয়া ভালো।)
শেষ কথা
ইথরা কেবল একটি দর্শনীয় স্থান নয়, এটি ভবিষ্যতের সৌদি আরবের এক টুকরো ঝলক। আপনি যদি জ্ঞানপিপাসু হন কিংবা শিল্প-সংস্কৃতি ভালোবাসেন, তবে ইথরা আপনাকে মুগ্ধ করবেই।
ডিজিটাল স্ক্রিনে এই সৌন্দর্য পুরোপুরি উপভোগ করতে আমার তৈরি করা বিশেষ ভ্লগটি দেখতে ভুলবেন না। নিচে লিংক দেওয়া রইলো:

0 Comments